ঢাকাSaturday , 24 February 2024

কলাপাড়ায় গোলের রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে মজাদার গুড়

মোঃ জাহিদ তালুকদার
জানুয়ারি ৯, ২০২৪ ৫:৪১ অপরাহ্ণ । ১১৫ জন
link Copied

উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় শীত মওসুমে প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বেরিয়ে গোলের রস সংগ্রহের ব্যাস্ত গাছিরা প্রথমে গাবনার মাথার ওপর প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ বার পা দিয়ে দোয়ানো হয়। দোয়ানো শেষ হলে গাবনা কেটে পাত্র বেঁধে রেখে গোলের রস সংগ্রহ করা হয়। এরপর শুরু হয় বাড়ির উঠোনে বসে রস দিয়ে গুড় তৈরি কাজ। আর সেই গুড় কলাপাড়া বাজারে বিক্রি করছেন গাছিরা।

ছোট ছোট খাল ভরাট হওয়ায় লবন পানির ধরে রাখতে অসুবিধায় ঐতিহ্যবাহী এ গোলগাছ এখন ক্রমেই ধ্বংস হতে বসেছে। একসময় এ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন খাল-বিল ও নদীর তীরে প্রচুর গোলের বাগান দেখা যেত। গাছের নাম গোল হলেও আকৃতি অনেকটা নারিকেল পাতার মতো। আশ্বিন-কার্তিক মাসে গোলগাছে লম্বা ছড়ায় গাবনা ফল ধরে। কৃষক ভালো মানের রস আহরণের জন্য অগ্রহায়ন মাসের শেষে ছড়াটি রেখে ফলসহ বাকি অংশ কেটে ফেলেন। তার পরে ছড়াটি যত্নসহ রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হয়। ফালগুন মাস পর্যন্ত দিনে দু’বার মাটির হাঁড়ি পেতে রস সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত রস আগুনে তাপ দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। সামান্য লবনাক্ত স্বাধের এ গুড়ের পরিচিতি একসময় এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটি বেশ বাণিজ্যিক প্রসারতা লাভ করেছে।

গোল গাছের গাছের উচ্চতা প্রায় ১৫ থেকে ১৮ ফুটের বেশি। সাধারণত লবণাক্ত পলিযুক্ত মাটিতে ভালো জন্মায়। বিস্তৃর্ণ এলাকাসহ খালের ধার, চরাঞ্চল গোলগাছ চাষের উপযুক্ত স্থান। গোলগাছের বীজ (গাবনা) মাটিতে পুঁতে রাখলেই চারা জন্মায়। একেকটি গাবনায় ১৩০-১৫০টি পর্যন্ত বীজ থাকে। গোল চাষে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না। সহজলভ্য এবং ব্যয় কম হওয়ায় চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক। গোলগাছ চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া গোলের গুড় কৃমিনাশক বলে অনেকে মন্তব্য করেন। দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে গোলগাছ রয়েছে। তবে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া, কুয়াকাটা, গলাচিপা, রাঙ্গাবালি, বরগুনার জেলায়র আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা এলাকাসহ চরাঞ্চলে গোলগাছের বাগান রয়েছে।

স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, এই জনপদের সর্বত্র রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজনসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরের ছাউনি হিসেবে গোলপাতা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া শীত মওসুমে গোলবাগানের মালিকরা এর রস দিয়ে গুড় উৎপাদন করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে থাকেন। রস দিয়ে সুস্বাদু পায়েশ তৈরি করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করলে তারা জানান, উপকূলীয় এলাকায় যেসব গোলগাছের বাগান রয়েছে, তা প্রকৃতির দান। বনবিভাগের এক শ্রেণীর অসাধু বনকর্মীর সহযোগিতায় বনদস্যুরা অবাধে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এ গোল বাগানগুলো ধ্বংস হতে বসেছে। গোলগাছ চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক, সহজসাধ্য এবং ব্যয়ও খুব কম। এতে কোনো পরিচর্যা করতে হয় না।

কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামের কৃষক সুখো রঞ্জন মিত্র বলেন,আমার বাবা ব্রিটিশ পিরিয়ডের সময়ে এই দেশে জঙ্গল পরিস্কার করে বসবাস করে। তখন গোলগাছ থেকে রস কি ভাবে তৈরি করতেন তা আমাদের শিখিয়ে গেছেন। এখন আমার ছেলে, মেয়েকে রস থেকে গুড় করা শিখিয়েছি।

সরোজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দিপন মিত্র, স্ত্রী হেমলতা তাফালে গোলের মুথা ও পাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ঢোঙ্গায় রস দিয়ে গুড় তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমার শাশুড়িকে দেখি প্রতি বছর এই সময় রস জ্বাল দিতে। আবার তা দিয়ে গুড় তৈরি করতে। শাশুড়ি রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করার নিয়েম আমাকে শিখিয়েছে। এখন আমি রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে পারি।

গোলচাষি শিপন জানান, এখন বাজারে গিয়ে গুড় বিক্রি করতে হয় না। অনেক খুচরা বিক্রেতা বাড়িতে এসেই গুড় নিয়ে যান। প্রতি কেজি ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি করি। আর আমাদের দেশের লোক বিদেশে গুড় নিয়ে যায়। এই গুর এক বছরে নষ্ট হয় না।

ক্রেতা অটল পাল বলেন, ‘অন্য গুড়ের চেয়ে আলাদা স্বাদযুক্ত, সাশ্রয়ী হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে বলে গোলের গুড়ের ব্যাপক চাহিদা।