ঢাকাSunday , 26 May 2024
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের দরপতন শুরু হয়েছে: বিজিএমইএ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ১২, ২০২৩ ৫:০৭ অপরাহ্ণ । ২৩৮ জন

বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান

link Copied

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অন্যতম প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পোশাকের দরপতন শুরু হয়েছে, যেটা শিল্পের জন্য নতুন শঙ্কা তৈরি করছে। সার্বিকভাবে বিশ্ববাজার থেকে গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া পোশাকের দর ৮ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে। একই মাসে (আগষ্ট ২০২৩) বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের দর কমেছে ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

রোববার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ অফিসে ‘পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরি ও বর্তমান শ্রম পরিস্থিতি’ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে শুরু হয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। সেই ধাক্কায় বিশ্বে রেকর্ড মূল্যস্ফীতির যে চাপ তৈরি হয়, তা এখনো শেষ হয়নি। মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য উন্নত দেশগুলো সংকোচনশীল মূদ্রানীতি গ্রহন করায় আমাদের পন্যের খুচরা বিক্রয় কমে গেছে, প্রধান বাজারগুলোর পোশাক আমদানি কমে এসেছে। এরই মধ্যে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে আবারও ঘোরতর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতি,বিশেষ করে পোশাক শিল্পের জন্য নতুন আরেকটি শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। তারপরও আমরা চেয়েছি, শ্রমিক ভাইবোনদের জীবনকে স্বান্দ্যয়ময় করতে, যেহেতু স্থানীয় পর্যায়ে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারনে তারা একরকম চাপে রয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে সরকার গঠিত নূন্যতম মজুরি বোর্ড নূন্যতম মজুরি পর্যালোচনা করে ০৭ নভেম্বর ২০২৩ নূন্যতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা ঘোষনা করেছেন। নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী মজুরি ৫৬.২৫% বেড়েছে।

তিনি বলেন, পোশাক শিল্পে যত প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন। আমরাঘোষিত মজুরি মেনে নিয়েছি। যত কষ্টই হোক, এই মজুরি বাস্তবায়ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের বাস্তবতায় এই মজুরি বাস্তবায়ন করা অনেক উদ্যোক্তার জন্যই জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে। নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

তিনি আরও বলেন, সময়ের পরিক্রমায় নূন্যতম মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও শিল্পের সক্ষমতা সে অর্থে খুব বেশি বাড়েনি। চলতি ২০২৩ (পঞ্জিকা বছর) এর প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক পোশাক আমদানি ভ্যাল্যুতে কমেছে ২২.৮১%, যেখানে বাংলাদেশ থেকে তাদের আমদানি কমেছে প্রায় ২৩.৩৩%। একই সময়ে সারা পৃথিবী থেকে পরিমানে আমদানি কমেছে ২৫.১৬%, আর বাংলাদেশ থেকে কমেছে ২৯.৩৭%। শুধুমাত্র আগষ্টেই বাংলাদেশ থেকে ভ্যালুতে কমেছে ৩৩.৭১%,ও সেপ্টেম্বরে ৩৪.৭২% । চলতি ২০২৩ (পঞ্জিকা বছর) এর প্রথম ৮ মাসে ইউরোপের বৈশ্বিক আমদানি কমেছে ৯.৬১% এবং বাংলাদেশ থেকে কমেছে ১৩.৭১%, শুধুমাত্র আগষ্ট মাসেই কমেছে ২৬.০৬%। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি অক্টোবর ২০২২ এর তুলনায় ১৩.৬৪% হ্রাস পেয়েছে। এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে পোশাক রপ্তানির কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত রপ্তানি পারফরমেন্স ২৮.৩৫% নিচে নেমে এসেছে।

ফারুক হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক কারণের জের ধরে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বহুগুন বেড়েছে। বিগত ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সময়ে গ্যাসের মূল্য বেড়েছে ২৮৬.৫% এবং বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে ২১.৪৭%। গত ৫ বছরে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০% বেড়েছে। শুধু তাই নয়, উন্নত দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, এর ফলে আমাদের ক্রেতাদেরও কস্ট অব ফান্ড বেড়ে গেছে, যার চাপ বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

তিনি বলেন, শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৮৮৫টি পোশাক কারখানা বিজিএমইএ এর সদস্যপদ গ্রহন করলেও কালের পরিক্রমায় ৩৯৬৪টি সদস্য কারখানা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২৯২১টি সদস্য কারখানার মধ্যে ২৩৩৯টি কারখানা বিজিএমইএ’তে তাদের সদস্যপদ নবায়ন করেছে। এই ২৩৩৯টি সদস্য কারখানার মধ্যে মাত্র ১৬০০টি সদস্য কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার এনে কাজ করছে। অর্থাৎ আমাদের এ মুহুর্তে সরাসরি রপ্তানিকারক কারখানার (সরাসরি অর্ডার নিয়ে কাজ করা) সংখ্যা মাত্র ১৬০০টি। সদস্যপদ নবায়নকৃত ২৩৩৯টি কারখানার মধ্যে ১৬০০ কারখানা বাদে বাকী কারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা বিভিন্ন ব্যাংক দেনা ও দায়ের কারণে সরাসরি ব্যাক-টু-ব্যাক খুলতে পারছে না। ফলে তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার নিতে পারছে না। এই সদস্য কারখানাগুলো মূলত সাব-কন্ট্রাক্ট এর মাধ্যমে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। অবশিষ্ট কারখানাগুলো ব্যাংক দেনা ও আর্থিক সংকটের কারনে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তারা আগামীতে দেনা পরিশোধ করে ব্যবসায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক। এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, শিল্পের উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যাও বাড়ছে।

পোশাক শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, মজুরি বৃদ্ধির পরও আন্দোলনের নামে বিভিন্ন জায়গায় কারখানা ভাংচুর করা হচ্ছে। মজুরি ঘোষনার পর থেকে বেশ কিছু কারখানায় অজ্ঞাতনামা কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক অযৌক্তিক দাবিতে বেআইনিভাবে কর্মবিরতি পালন করে কর্মকর্তাদের মারধর করেছে, কারখানার ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কারখানাগুলো এ ব্যাপারে আমাদেরকে ভিডিও ফুটেজ দিয়েছে, মামলার কপিও আমাদেরকে দিয়েছে। আপনারা চাইলে আপনাদেরকে এসব ফুটেজ, মামলার কপি আপনাদেরকে দিতে পারি। উদ্ভূত পরিস্থিতে আশুলিয়া, কাশিমপুর, মিরপুর ও কোনাবাড়ি এলাকার প্রায় ১৩০টি পোশাক কারখানা কারখানা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কারখানার সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে কারখানার সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেসব কারখানা শ্রমিকরা কাজ করতে আগ্রহী ,সেগুলোতে কাজ চলছে । তাদের কাজ চলমান থাকবে।

তিনি বলেন, নতুন মজুরি বাস্তবায়ন আমাদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হলেও আমরা এটি বাস্তবায়ন করবো। এক্ষেত্রে ক্রেতা, শ্রমিক, সরকার এবং সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

ফারুক হাসান বলেন, দেশ ও শিল্পের স্বার্থে, শ্রমিক ভাইবোনদের কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে, যদি কোন কারখানায় শ্রমিক ভাইবোনেরা কাজ না করেন, কাজ না করে কারখানা থেকে বের হয়ে যান, কারখানা ভাংচুর করেন,তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক ভাই-বোন ও সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষায় শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় কারখানা বন্ধ রাখতে পারবেন। যতদিন না শ্রমিক ভাংচুর বন্ধ হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারছে – ততোদিন পর্যন্ত কারখানা কর্তৃপক্ষ শিল্প ও সম্পদ রক্ষায় ১৩ (১) ধারায় কারখানা বন্ধ রাখতে পারবেন। প্রতিটি উদ্যোক্তার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে বহিরাগতদের হাত থেকে তার নিজস্ব শিল্প ও সম্পদ রক্ষার।

তিনি বলেন, যেহেতু বর্তমানে পোশাকখাতে অনেক কারখানায় কাজ কম, ক্রেতারা নতুন করে অর্ডার দেয় বন্ধ রেখেছেন, তাই আমরা নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখতে বলেছি। পরিস্থিতি অনূকূলে এলে আবার নতুন নিয়োগদান করা হবে। আপনারা দেখছেন যে ব্যাংক দেনা, অর্ডার ক্যানসেলেশন বা যে কোন কারনে কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও মালিককে ঠিকই মজুরি পরিশোধ করতে হয়। তাই বর্তমানে যখন কাজ কম, তখন আমরা কারখানাগুলোকে বলছি নতুন করে নিয়োগ না দিতে। এ মুহুর্তে নতুন নিয়োগ কারখানাগুলোর উপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করবে। আর কোন কারখানার যদি কাজ বেশি থাকে, তাহলে সে কারখানাটি যে কারখানায় কাজ কম, সেখান থেকে কাজ করিয়ে নিবে। এতে করে কম কাজের কারখানাগুলোকে সাহায্য করা হবে এবং সব কারখানাগুলোর কাজের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং যে ওভার ক্যাপাসিটি পরিস্থিতি তৈরি
হয়েছে, তা কিছুটা প্রশমিত হবে।

সরকারের প্রতি অনুরোধ রেখে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, এ শিল্পকে নিয়ে যারা চক্রান্ত করছে, তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিন। সেই সাথে শিল্প-কারখানা চালানোর জন্য আমাদেরকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিন। রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। স্মর্তব্য যে, এ মূহুর্তে প্রবাসী আয়খাতে মন্থর ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। । এ অবস্থায় রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প বিশেষ মনোযোগের দাবী রাখে।

এসআর